গণমুখী নগর পরিকল্পনাঃ কিছু মৌলিক বিষয়

মানুষের সার্বিক কল্যাণের কথা চিন্তা করে একটি টেকসই নগর গড়ে তোলার জন্য গণমুখী নগর পরিকল্পনার প্রতি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। গণমুখী নগর পরিকল্পনায় নগরকে কিভাবে সর্বস্তরের মানুষের জন্য বাস যোগ্য এবং আন্তরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায় সেদিকে নজর দেয়া হয়। নগরের যে কোন অবকাঠামো বা উন্নয়ন কর্মকান্ড কিভাবে সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য সহজগম্য করা যায় সেটিই গণমুখী নগর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

কিছু দেশে নগর পরিকল্পনা খুব বেশী প্রাইভেট কার নির্ভর। বর্তমান আমাদের দেশেও নগরে পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে যে কোন পরিকল্পনায় যান্ত্রিক যানবাহনের চলাচলকেই গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশী। যে কারণে অন্যান্য মাধ্যমে চলাচলের বিষয়টি এবং মানুষের সার্বিক কল্যাণের দিকটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। নগরে যান্ত্রিক বাহনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আমরা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করছি, যা নগরের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত দিক দিয়ে অযাচিত ক্ষতি বয়ে আনছে।

নগরের আবাসন সংস্থান করতে গিয়েও আমরা মানুষের কল্যাণের দিকটি চরমভাবে উপেক্ষা করছি। নগরের মধ্যে এবং নিকটবর্তী স্থানে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্লট ভিত্তিক উন্নয়ন করায় মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক যোগাযোগের সুযোগ কমে যাচ্ছে। এ ধরনের আবাসিক এলাকায় কাছাকাছি বাজার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান, বিনোদনের সুবিধা ও মানুষের মেলামেশার জন্য উন্মূক্ত স্থান না থাকায় পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যহত হয় এবং দূরে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। একই ভাবে এপার্টমেন্ট ভিত্তিক যে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে তাতেও মানুষের সাথে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ রাখা হচ্ছে না। এর ফলে আগে আমাদের এলাকা ভিত্তিক যে আন্তরিক পরিবেশ ছিল তা ক্রমেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে যা সমাজের সার্বীক নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ।

এখন পর্যনত্দ আমাদের শহরগুলোতে কাছাকাছি বাজার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান, বিনোদনের সুবিধা অধিকাংশ যাতায়াতই হয়ে থাকে স্বল্প দূরত্বে। আর এর জন্য হেঁটে চলা বা অযান্ত্রিক যানের ব্যবহার হয়ে থাকে সবচেয়ে বেশী। কিন্তু আমাদের নগরের পরিবহন পরিকল্পনাগুলো কখনই এই সকল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যমকে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। একই সাথে নগরের ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং পরিবহন পরিকল্পনার মধ্যে যে ওতোপ্রোত সম্পর্ক বিদ্যমান তা-ও এখানে কখনও তেমন ভাবে অনুধাবন করা হয়নি। আমাদের নগরগুলোর অধিকাংশ এলাকা মিশ্র ব্যবহার ভিত্তিক। এখানে খুব অল্প দূরত্বেই প্রায় সব নাগরিক সুবিধাদি পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের বর্তমান নগর পরিকল্পনা বা পরিবহন পরিকল্পনা ক্রমেই এই সুবিধাটুকু নষ্ট করে দিচ্ছে। মানুষ ক্রমেই বেশী দূরত্বে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বাড়িয়ে দিচ্ছে যানজট।

নগর পরিকল্পনায় নগরের টেকসই দিকটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন। বিশ্বের কিছু উন্নত দেশে নগর পরিবহন ব্যবস্থায় খুব বেশী জীবাশ্ম জ্বালানী নির্ভর হয়ে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য অনেকাংশেই দায়ী। দেখা যায় আমেরিকান শহরগুলিতে এশিয়ান শহরগুলির চেয়ে পরিবহণ খাতে ৮ গুন বেশি জ্বালানী ব্যবহুত হয়। বর্তমানে জ্বালানীর ক্রমবর্ধমান মূল্য ও এর স্বল্পতার প্রেক্ষিতে আমাদের এখনই ভেবে দেখা প্রয়োজন আমরা কোন ধরনের নগরের পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবহন পরিকল্পনায় এখন থেকেই জ্বালানী সাশ্রয়ী (জন পরিবহন) এবং জ্বালানী বিহীন (অযান্ত্রিক যান) – যানবাহনকে গুরুত্ব না দেয়া হলে তা শুধুমাত্র আমাদের জ্বালানী নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে এবং নগরের অর্থনীতির জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হবে।

বিভিন্ন সময়ে বলা হয়ে থাকে নগরের স্বাভাবিক সঞ্চালনের জন্য ২৫ ভাগ রাস্তা প্রয়োজন। কিন্তু রাস্তার প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে নগরের ভূমি ব্যবহারের ধরণ ও এর পরিবহন ব্যবস্থাপনার কৌশলের উপর। নগরের যানজট নিরসনে শুধুমাত্র রাস্তা নির্মাণ কখনই সুফল বয়ে আনে না। কারণ যখনই কোন রাস্তা নির্মাণ করা হয়, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সেখানে নতুন যানবাহন এসে আবার যানজটের তৈরী করে। নগরের পরিবহন ব্যবস্থায় যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাইভেট কার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত নতুন রাস্তা নির্মাণ কোন সুফলই বয়ে আনবে না।

 

সেক্ষেত্রে জ্বালানীমুক্ত ও পাবলিক পরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন এবং প্রাইভেট কারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেখা যায় পথচারী, সাইকেল, রিকশা জ্বালনীমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব এবং পাবলিক পরিবহণও তুলনামূলক কম জ্বালানী লাগে আর প্রাইভেট গাড়িতে প্রচুর জ্বালানী ব্যবহার করতে হয়।

একটি টেকসই নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সবার প্রথমেই প্রাধান্য দিতে হবে পথচারীদের। মানুষের হেঁটে চলার সুবিধা করে দেয়ার জন্য নগরের পরিবহন পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা থাকতে হবে। পথচারীদের পর প্রাধান্য দিতে হবে বিভিন্ন অযান্ত্রিক যানবাহনকে (সাইকেল, রিকশা ইত্যাদি) যা স্বল্প দূরত্বে কার্যকরী বাহন হিসেবে কাজ করে। অযান্ত্রিক যানের পর নগরের পরিবহন পরিকল্পনায় প্রাধান্য দেওয়া উচিত পাবলিক পরিবহকে এবং অবশ্যই প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ জরুরী।

গণমুখী নগর পরিকল্পনার স্বার্থে কিছু সুপারিশমালাঃ
নগর পরিকল্পনায় মিশ্র এলাকা গড়ে তোলার উপর মনযোগ দিতে হবে। যেমন-আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, বাজার, কর্মস্থল, বিনোদন ইত্যাদি সুযোগ সুবিধা কাছাকাছি দূরত্বে থাকে।
নগরের পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আমাদের বর্তমান ধারণার পরিবর্তন করতে হবে। যান্ত্রিক যানবাহনের পরিবর্তে মানুষের স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্য চলাচলকে প্রাধান্য দিতে হবে।
নগরের পরিবহন পরিকল্পনায় পায়ে হাঁটাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে এবং পথচারীদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই সকর অবকাঠামো নির্মাণ/সংস্কার করতে হবে।
অযান্ত্রিক যানবাহন (সাইকের, রিকশা ইত্যাদি)-এর ব্যবহার উন্নত করতে হবে এবং এদের জন্য প্রয়োজনে পৃথক লেনের ব্যবস্থা করতে হবে।
নগরের পরিবহন ব্যবস্থায় পাবলিক পরিবহনের উন্নয়নকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে এবং এতে সকল শ্রেণীর মানুষের সমান সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাইভেট কার এবং অন্যান্য ব্যাক্তিগত যানের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পার্কিং চার্জ বাড়িয়ে এবং ছোট যানবাহনের উপর উচ্চ শুল্ক ধার্য করে এর ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
যাতায়াত চাহিদা ব্যবস্থাপনাকে ভিত্তি করে নগরের পরিবহন পরিকল্পনা করতে হবে। শুধুমাত্র রাস্তা এবং অন্যান্য সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে পরিবহন সমস্যা সমাধানের পন্থা পরিহার করতে হবে।

Advertisements

Tags: , ,

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: